জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী পরিবারগুলোর সন্তানদের বড় একটি অংশ বেড়ে উঠছে ওই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মধ্যে। তাদের পড়ালেখা, বেড়ে ওঠা, বন্ধুত্ব—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি।
তবে প্রবাসী বাংলাদেশি অভিভাবকদের চাওয়া, প্রজন্মটি যেন ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়। জাপানের মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানদের তাঁরা বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত রাখতে সুযোগ চান। এর জন্য তাঁরা টোকিওতে বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
দাবি অনুসারে জাপানপ্রবাসীরা বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার স্বীকৃতি চান।
প্রবাসীদের দাবি, জাপানে আন্তর্জাতিক মানের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোতে পড়ালেখার ব্যয় বিপুল। ফলে সাধারণ আয়ের বাংলাদেশি সন্তানদের ওই সব প্রতিষ্ঠানে পড়ানো কঠিন। অন্যদিকে জাপানি স্কুলে পড়ালেখা করলেও সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম, বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি শেখার সুযোগ সীমিত। এই অবস্থায় টোকিওতে বাংলাদেশি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের যুক্ত রাখা সহজ হবে।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা বাংলাদেশিরা জানান, বিদেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা সন্তানদের নিজের আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তাঁরা এই স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি করছেন।
টোকিওর আকাবানের কিরিগাওয়াকা এলাকায় ২২ বছর ধরে বসবাস করছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আলতাফ কাশেম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘টোকিওতে একটি বাংলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বাস্তব প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। শুধু কিরিগাওয়াকা এলাকায়ই ৭০টির বেশি বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করছে। এসব পরিবারের অধিকাংশের দুটি করে সন্তান রয়েছে।
হিসাব মতে, এসব পরিবারের মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা অন্তত ১০০ থেকে ১৫০।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা জাপানে জন্ম নিচ্ছে, এখানেই বড় হচ্ছে এবং জাপানি স্কুলে পড়ালেখা করছে। এতে কোনো সমস্যা নেই। তারা জাপানের ভাষা ও শিক্ষায় দক্ষ হয়ে উঠুক, সেটিই আমরা চাই। কিন্তু একই সঙ্গে তারা যেন বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলসহ আন্তর্জাতিক মানের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার খরচ অনেক বেশি। সাধারণ বাংলাদেশি পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সহজ নয়।’
পারিবারিক বন্ধন নিয়ে উদ্বেগ : জাপানে ২৩ বছর ধরে বসবাস করছেন সাঈদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুদের জন্য বাংলা ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।’ সাঈদ সিদ্দিকী বলেন, ‘জাপানে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনযাপন ও পারিবারিক সম্পর্কের ধরন আমাদের দেশের তুলনায় আলাদা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব তৈরি হয়। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা জাপানের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের পারিবারিক বন্ধন, শ্রদ্ধাবোধ ও মূল্যবোধ সম্পর্কেও জানুক।’
জাপানি ভাষার শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা শেখার সুযোগ চান অভিভাবকরা : জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প চাই না। আমাদের সন্তানরা জাপানি ভাষা শিখবে, জাপানের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পড়ালেখা করবে—সেই সুযোগ তো তাদের থাকছেই। কিন্তু পাশাপাশি তারা যেন বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
শুধু ভাষা নয়, পরিচয় রক্ষারও উদ্যোগ : প্রবাসীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাপানে প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাঁদের একটি অংশ পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ মেয়াদে দেশটিতে বসবাস করছে। ফলে সেখানে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার বিষয়টি ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাপানের সেন্ট লুক’স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের সন্তানদের জন্য বাংলা ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতিতে দক্ষ হয়ে উঠবে, এটি তাদের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মাতৃভাষা বাংলা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় থাকাও প্রয়োজন। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি নিজের শিকড় ও পরিচয়ের প্রধানতম মাধ্যমও।’








